জামদানি শাড়ি কেনার আগে ভুলগুলো জেনে নিন: আসল ঢাকাই জামদানি চিনবেন কীভাবে

ধরুন, সামনের মাসে বিয়ের নিমন্ত্রণ, আর আপনি ঠিক করেছেন এবার একটা জামদানি শাড়ি কিনবেন। ফোনে খুঁজতে বসে দেখলেন, দুটো শাড়ি প্রায় একই রকম দেখতে, অথচ একটার দাম আরেকটার চেয়ে অনেক বেশি। এমন সময় মনে হয়, কোনটা সত্যিকারের হাতে বোনা জামদানি আর কোনটা শুধু দেখতে সেরকম, সেটা বুঝব কীভাবে? চলুন, আগে যে ভুলগুলো সবাই করে সেগুলো সেরে নিই। তারপর দেখব হাতে নিয়ে কী যাচাই করবেন।
জামদানি শাড়ি কিনতে গিয়ে এই পাঁচ ভুল সবাই করে
ভুল ১: শুধু ছবির নকশা দেখে মন গলে যাওয়া। ছবিতে ছাপা নকশাও বেশ ঝকঝকে দেখায়। আসল জামদানির নকশা তাঁতি বুনতে বুনতেই তোলেন, ওপর থেকে ছাপা বা এমব্রয়ডারি করা থাকে না। সেই ফারাক ছবিতে ধরা কঠিন, তাই ছবির ক্লোজ-আপ আর উল্টো পিঠ না দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
ভুল ২: দামকে একমাত্র মাপকাঠি বানানো। খুব কম দাম দেখলে একটু থামুন, কারণ ওটা ছাপা বা মেশিনের কাজ হতে পারে। আবার বেশি দাম মানেই যে আসল, তাও নয়। দামের পেছনে কী আছে, সেটা জানাই আসল কাজ। এ নিয়ে একটু পরে বলছি।
ভুল ৩: "ঢাকাই জামদানি" নাম শুনেই ধরে নেওয়া যে হাতে বোনা। নামটা অনেক শাড়ির সঙ্গেই জুড়ে দেওয়া হয়। জামদানি-ধাঁচের শাড়ি খারাপ কিছু নয়, সমস্যা তখনই, যখন মেশিনে বোনা শাড়িকে হাতে বোনা বলে বোঝানো হয়। বিবরণে কী লেখা আছে, সেটা পড়ুন।
ভুল ৪: উল্টো পিঠ না দেখা। এটাই সবচেয়ে বেশি হয়, আবার সবচেয়ে সহজে এড়ানো যায়।
ভুল ৫: কোন অনুষ্ঠানে পরবেন, তা না ভেবে কেনা। বিয়ের মঞ্চে যে ঘন কাজের শাড়ি মানায়, অফিসে বা ঘরোয়া দাওয়াতে সেটা ভারী লাগতে পারে। আগে ঠিক করুন, শাড়িটা কতবার পরবেন আর কোথায়।
হাতে নিয়ে আসল জামদানি শাড়ি চেনার উপায়
আগেই বলে রাখি, কোনো একটা লক্ষণ দেখেই রায় দেবেন না। কয়েকটা জিনিস মিলিয়ে দেখুন।
- উল্টো পিঠ দেখুন। হাতে বোনা জামদানিতে নকশার সুতা উল্টো দিকেও দেখা যায়, নকশার মাঝখানে ছোট ছোট সুতার প্রান্তও থাকতে পারে। ছাপা শাড়ির উল্টো পিঠে নকশা ফ্যাকাশে বা একেবারে আলাদা দেখায়।
- আঙুল বুলিয়ে দেখুন। বোনা নকশা কাপড়েরই অংশ, আলাদা কোনো স্তর নয়। মসৃণ রঙের আবরণের মতো লাগলে সেটা ছাপা হতে পারে।
- স্পর্শ আর ঝুল দেখুন। ভালো জামদানি নরম হয়, গায়ে সুন্দর করে পড়ে। খুব শক্ত, কাগজের মতো খসখসে বা বাড়তি চকচকে লাগলে সুতার ধরন নিয়ে প্রশ্ন করুন।
- আলোর দিকে ধরুন। জমিনের বুনন সমান আর ঘন কি না দেখুন। মাঝে মাঝে ফাঁক বা ঢিলা অংশ থাকলে মান কম হতে পারে।
- সামান্য অমিল দেখে ঘাবড়াবেন না। নকশার মাপে ছোট তারতম্য হাতের কাজের চিহ্ন হতে পারে। তবে মেশিনের কাজও নিখুঁত হয়, তাই শুধু এটা দেখে আসল-নকল বলা যায় না।
আর সবশেষে বিক্রেতাকে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করুন, কোন সুতায় বোনা, কোথায় বোনা, কতদিন লেগেছে। উত্তর পরিষ্কার হলে আর পণ্যের বিবরণের সঙ্গে মিললে ভরসা বাড়ে। এড়িয়ে গেলে সেটাও একটা ইঙ্গিত।
জামদানি শাড়ির ছবি ও দাম: অনলাইনে কিনছেন?
অনলাইনে কেনা এখন সবারই অভ্যাস, তাই এখানে একটু বাড়তি সতর্ক থাকা ভালো। কেনার আগে দেখে নিন:
- উল্টো পিঠ আর নকশার ক্লোজ-আপ ছবি আছে কি না।
- দিনের আলোয় তোলা ছবি আছে কি না, কারণ আলোর কারণে রঙ বদলে যায়।
- শাড়ির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর ব্লাউজ পিস আছে কি না।
- সুতার ধরন পরিষ্কার লেখা আছে কি না।
- পছন্দ না হলে কী নিয়ম, তা কেনার আগেই জেনে রাখা।
মজার কথা, জামদানি শাড়ি দাম নিয়ে সবার প্রশ্ন, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক বলা যায় না। কারণ একই রকম দেখতে দুটো শাড়ির পেছনের খরচ আলাদা হতে পারে। দাম মূলত নির্ভর করে:
- সুতার ধরন ও মিহিভাব: সুতি, সুতা-সিল্ক মিশ্রণ নাকি পুরো সিল্ক।
- নকশার ঘনত্ব: শুধু পাড়ে নকশা, নাকি পুরো জমিন জুড়ে বুটি বা জালি। নকশা যত ঘন, বুনতে তত সময়।
- কারিগরের দক্ষতা আর লেগে যাওয়া সময়: জটিল নকশায় কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি লাগতে পারে।
- জরি বা বাড়তি সুতার কাজ, যদি থাকে।
- কোথা থেকে কেনা হচ্ছে: সরাসরি কারিগরের কাছ থেকে, নাকি কয়েক হাত ঘুরে।
তুলনা করতে হলে একই সুতা, একই নকশার ঘনত্ব আর একই মাপের শাড়ি পাশাপাশি রাখুন, নইলে তুলনাটাই ভুল হয়ে যায়।
পছন্দের শাড়ি খুঁজতে চাইলে ShopeMart-এর ডিজাইনার শাড়ি ক্যাটাগরিতে একবার ঘুরে দেখতে পারেন। কোনোটা ভালো লাগলে আগে পণ্যের বিবরণে কাপড় আর কাজের কথা পড়ে নিন।
বিয়ের জামদানি শাড়ি: কীভাবে বাছবেন
বিয়ের জামদানি শাড়ি অনেকে পছন্দ করেন, কারণ এতে ঐতিহ্যের ছোঁয়া আছে, আবার বেনারসির চেয়ে হালকা। আমার পরামর্শ, তিনটা জিনিস ভাবুন।
প্রথমে রঙ। লাল, মেরুন বা গাঢ় রঙ বেশি বেছে নেওয়া হয়, তবে নিজের পছন্দ আর অনুষ্ঠানের আবহই আসল। তারপর নকশা। ভারী কাজ ছবিতে ভালো ওঠে, কিন্তু হালকা নকশা সারাদিন পরে থাকতে আরাম দেয়। শেষে ব্লাউজ আর গয়না। জামদানির নকশা নিজেই ব্যস্ত হলে গয়না একটু সাদামাটা রাখলে সব মিলিয়ে ভালো দেখায়।
তিন ধরনের বিয়ের শাড়ি পাশাপাশি তুলনা করতে চাইলে পড়ে নিন বিয়ের শাড়ি: বেনারসি, কাতান নাকি জামদানি। আর অনুষ্ঠানের জন্য হালকা ঝলমলে কিছু দেখতে ভালো লাগলে পার্টি ওয়্যার শাড়ি ক্যাটাগরিটাও দেখতে পারেন।
কিনে ফেলেছেন? এবার যত্নের কথা
জামদানি নরম আর সূক্ষ্ম, একটু যত্ন নিলে অনেক দিন ভালো থাকে।
- প্রথম কয়েকবার সম্ভব হলে ড্রাই ক্লিন করান। বাড়িতে ধুলে ঠান্ডা পানিতে হালকা ডিটারজেন্টে আলতো করে ধোবেন।
- মুচড়ে নিংড়াবেন না, ছায়ায় মেলে শুকান।
- ইস্ত্রি করবেন উল্টো পিঠে, কম তাপে, মাঝে পাতলা সুতির কাপড় রেখে।
- একই জায়গায় বছরের পর বছর ভাঁজ থাকলে সুতা দুর্বল হতে পারে, তাই মাঝেমধ্যে ভাঁজ বদলে নিন।
- নরম সুতির কাপড়ে মুড়ে রাখুন, প্লাস্টিকে নয়।
- পারফিউম শাড়িতে নয়, শাড়ি পরার আগে নিজের গায়ে দিন।
তিনটে ছোট প্রশ্ন, যা অনেকেই করেন
জামদানি শাড়ি কি রোজ পরা যায়?
হালকা সুতির জামদানি অনেকে নিয়মিতই পরেন। ভারী কাজ বা সিল্ক মেশানো শাড়ি বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য বেশি মানায়।
জামদানি শাড়ি কি ধুয়ে পরা যায়?
সুতির জামদানি সাবধানে হাতে ধোয়া যায়। ভারী কাজ বা সিল্ক হলে ড্রাই ক্লিনই নিরাপদ, আর শাড়ির সঙ্গে নির্দেশনা দেওয়া থাকলে সেটাই মানুন।
আসল জামদানি চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় কী?
উল্টো পিঠ দেখুন, নকশা বোনা না ছাপা তা আঙুলে যাচাই করুন, আর বিক্রেতার কাছে সুতা ও বুননের জায়গার কথা জেনে নিন। এক-দুটো লক্ষণে নয়, সবগুলো মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।






