পড়াশোনা বা চাকরির পাশাপাশি রিসেলিং: সময় ভাগ করার দৈনিক রুটিন ও চেকলিস্ট

রিসেলিংয়ের একটা বড় সুবিধা হলো, এটা পার্ট টাইম শুরু করা যায়। অনেকেই পড়াশোনা, চাকরি বা সংসার সামলে ব্যবসাটা চালান। কিন্তু সময় ঠিকমতো ভাগ না করলে একদিকে ব্যবসা অগোছালো হয়ে যায়, অন্যদিকে নিজের ওপর চাপ বাড়ে। এই লেখায় একটা বাস্তবসম্মত দৈনিক রুটিনের ধারণা আছে, যা আপনি নিজের সুবিধামতো বদলে নিতে পারবেন।
আগে বুঝে নিন, দিনে কতটা সময় দিতে পারবেন
শুরুতে নিজেকে প্রশ্ন করুন: দিনে ঠিক কত ঘণ্টা আমি ব্যবসায় দিতে পারি? কোন সময়গুলো ফাঁকা থাকে? অফিসের পর, ক্লাসের ফাঁকে, নাকি রাতে? উত্তর যা-ই হোক, সেটা সৎভাবে ঠিক করুন। দিনে দুই ঘণ্টা দিতে পারবেন বলে যদি পাঁচ ঘণ্টার পরিকল্পনা করেন, কিছুদিনের মধ্যেই সব ভেস্তে যাবে। ছোট কিন্তু নিয়মিত সময়ই বড় ফল আনে।
কাজগুলোকে ভাগ করে নিন
ব্যবসার কাজ কয়েক ধরনের। এগুলোকে আলাদা করে দেখলে কোন কাজ কখন করবেন, ঠিক করা সহজ হয়।
- যোগাযোগের কাজ: ইনবক্সের উত্তর দেওয়া, কাস্টমারের সাথে কথা বলা, অর্ডার নিশ্চিত করা। এই কাজ দ্রুত করতে হয়, তাই দিনে কয়েকবার ছোট ছোট সময়ে করুন।
- অর্ডারের কাজ: অর্ডার দেওয়া, অর্ডারের অবস্থা দেখা, কাস্টমারকে জানানো।
- কনটেন্টের কাজ: ছবি তোলা, ভিডিও বানানো, পোস্ট লেখা আর সাজানো। এই কাজে মনোযোগ লাগে, তাই একসাথে বড় সময় দিন।
- হিসাবের কাজ: লাভ-লোকসানের হিসাব, ওয়ালেট দেখা, পেআউট নেওয়া। সপ্তাহে একবার বসে করলেই চলে।
- শেখার কাজ: নতুন পণ্য দেখা, বাজারের খবর রাখা, নতুন কৌশল শেখা।
একটা নমুনা দৈনিক রুটিন
এটা একটা উদাহরণ মাত্র। আপনার নিজের সময় অনুযায়ী বদলে নিন।
- সকাল (১৫ থেকে ২০ মিনিট): ইনবক্সে জমে থাকা মেসেজের উত্তর দিন। Orders List-এ গত দিনের অর্ডারের অবস্থা দেখুন। আজ কী পোস্ট করবেন, ঠিক করুন।
- দুপুর বা বিরতির ফাঁকে (১০ মিনিট): নতুন মেসেজ দেখে ছোট উত্তর দিন।
- সন্ধ্যা (৪০ থেকে ৬০ মিনিট): পোস্ট দিন, নতুন ছবি বা ভিডিও তুলুন বা সম্পাদনা করুন। এই সময়ে কাস্টমাররাও সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকেন।
- রাত (১৫ থেকে ২০ মিনিট): দিনের অর্ডার আর কথোপকথন দেখে নিন। কাল কী করতে হবে, লিখে রাখুন। ইনবক্সে বাকি থাকা মেসেজের উত্তর দিন।
সপ্তাহে একদিন, যেমন ছুটির দিনে, একটু বড় সময় রাখুন হিসাব, নতুন পণ্য বাছাই আর সামনের পরিকল্পনার জন্য।
কাজ কমানোর কয়েকটা কৌশল
- তৈরি উত্তর রাখুন। একই প্রশ্নের উত্তর বারবার লিখতে হয় না, যদি আগে থেকে লিখে রাখেন। নিয়ম আছে কাস্টমার সার্ভিস গাইডে।
- একসাথে অনেক ছবি তুলুন। সপ্তাহে একদিন বসে কয়েকটা পণ্যের ছবি আর ভিডিও তুলে রাখুন। তারপর সারা সপ্তাহ একটা একটা করে পোস্ট করুন। ছবি তোলার নিয়ম আছে মোবাইলে ভালো ছবি ও ভিডিও তোলার গাইডে।
- পোস্ট আগে থেকে ঠিক করে রাখুন। ফেসবুকের পেজে পোস্ট আগে থেকে নির্ধারিত সময়ে প্রকাশের ব্যবস্থা থাকে। একদিনে কয়েকটা পোস্ট বানিয়ে ভবিষ্যতের সময় বসিয়ে রাখলে প্রতিদিন বসে লিখতে হয় না।
- পণ্যের সংখ্যা সীমিত রাখুন। বেশি পণ্য মানে বেশি প্রশ্ন, বেশি কাজ। শুরুতে অল্প কয়েকটা পণ্য নিয়ে ভালো করে কাজ করুন।
- নোটিফিকেশন বুদ্ধি করে ব্যবহার করুন। সব সময়ের নোটিফিকেশন মনোযোগ নষ্ট করে। ইনবক্সের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখুন।
কাস্টমারকে আগেই জানিয়ে রাখুন
আপনি যদি সব সময় উত্তর দিতে না পারেন, কাস্টমারকে জানিয়ে দিন। পেজের পরিচিতিতে বা স্বয়ংক্রিয় বার্তায় লিখুন, "আমরা সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে উত্তর দিই।" এতে কাস্টমার জানেন কখন উত্তর পাবেন, আর আপনার ওপর চাপও কমে।
সময় বাঁচানোর জন্য প্যানেলের সুবিধা কাজে লাগান
রিসেলার প্যানেলের ড্যাশবোর্ডের "Right now" অংশে এক নজরে দেখা যায় নতুন অর্ডার কয়টা, কয়টা আটকে আছে আর কয়টা পথে। রোজ কয়েক মিনিট এটা দেখে নিলেই আপনি জানেন কোথায় নজর দিতে হবে। আলাদা করে প্রতিটা অর্ডার খুঁজে দেখার দরকার হয় না।
ক্লান্তি এড়ান
ব্যবসা চালাতে গিয়ে নিজের শরীর আর মনের দিকে নজর না দিলে একসময় ক্লান্ত হয়ে সব ছেড়ে দিতে হয়।
- ঘুম ঠিক রাখুন। রাত জেগে কাজ করে পরদিন পড়াশোনা বা চাকরিতে সমস্যা হলে দুদিকেই ক্ষতি।
- ছুটির দিন রাখুন। সপ্তাহে একদিন ব্যবসার কাজ থেকে বিরতি নিন, অন্তত ইনবক্সে নজর কম দিন।
- প্রত্যাশা বাস্তব রাখুন। প্রথম মাসেই বড় আয় আসবে না। ধীরে ধীরে নিয়মিত থাকলে ফল আসে।
- একা না ভেবে সাহায্য নিন। পরিবারের কেউ প্যাকিংয়ের জায়গায় না থাকলেও ছবি তোলায় বা কাস্টমারের সাথে কথা বলায় সাহায্য করতে পারেন।
সাপ্তাহিক পর্যালোচনা
সপ্তাহের শেষে ১৫ মিনিট বসে নিজেকে তিনটে প্রশ্ন করুন:
- এই সপ্তাহে কী ভালো হয়েছে?
- কোথায় সময় নষ্ট হয়েছে?
- আগামী সপ্তাহে কোন একটা জিনিস বদলাব?
এই ছোট অভ্যাস আপনাকে ধীরে ধীরে আরও গোছানো করে তুলবে। হিসাব রাখার সহজ নিয়ম আছে রিপিট কাস্টমার ও হিসাব রাখার গাইডে।
দৈনিক চেকলিস্ট
- ইনবক্সের মেসেজের উত্তর।
- Orders List দেখা।
- আজকের পোস্ট।
- স্টকে সমস্যা আছে কি না দেখা।
- কাল কী করতে হবে, লিখে রাখা।
ব্যস্ত সময়ে কী করবেন
পরীক্ষা, অফিসের চাপ বা পারিবারিক ব্যস্ততার সময় ব্যবসা সামলানো কঠিন হয়ে যায়। এই সময়ের জন্য আগে থেকে একটা ছোট পরিকল্পনা রাখুন।
- কাস্টমারদের আগেই জানান। "আগামী এক সপ্তাহ আমি দেরিতে উত্তর দেব" ধরনের একটা ছোট ঘোষণা পোস্ট বা স্বয়ংক্রিয় বার্তায় দিয়ে রাখুন। আগে জানালে কাস্টমার বিরক্ত হন না।
- নতুন পণ্য আর বিজ্ঞাপন আপাতত থামান। যেসব কাজে বাড়তি মনোযোগ লাগে, সেগুলো পরে করুন। শুধু চলমান অর্ডার আর ইনবক্সের উত্তর ঠিক রাখুন।
- কেবল সেরা পণ্য নিয়ে কাজ করুন। যে কয়েকটা পণ্য সবচেয়ে ভালো চলে, ওগুলোতেই থাকুন। নতুন পরীক্ষার সময় এটা নয়।
- কোনো কাছের মানুষের সাহায্য নিন। তিনি ইনবক্সে ছোট প্রশ্নের তৈরি উত্তর দিতে পারেন, বা আপনার বদলে ছবি তুলে দিতে পারেন।
- কাজ শেষ হলে আবার ধীরে ধীরে শুরু করুন। হঠাৎ আগের গতিতে ফিরতে গিয়ে চাপ নেবেন না।
ব্যবসা থেমে গেলে আবার শুরু করা কঠিন, কিন্তু সামান্য মনোযোগ রাখলে ছোট বিরতি ব্যবসার ক্ষতি করে না। নিজের শরীর আর পড়াশোনা বা চাকরি সবসময় আগে। ব্যবসা সবসময় আপনার জীবনকে সাহায্য করার জন্য, চাপ বাড়ানোর জন্য নয়।
ছোট ছোট জয় উদযাপন করুন
প্রতি সপ্তাহে কয়েকটা ছোট লক্ষ্য ঠিক করুন, যেমন এই সপ্তাহে পাঁচটা পোস্ট, দুটো নতুন কাস্টমার বা সব মেসেজের একদিনের মধ্যে উত্তর। লক্ষ্য ছুঁতে পারলে নিজেকে একটু প্রশংসা করুন। এতে কাজের উৎসাহ ধরে থাকে, আর ধীরে ধীরে অভ্যাসটা পাকা হয়।
প্রায়ই করা প্রশ্ন
দিনে কত সময় দিলে ব্যবসা চলবে?
এর কোনো একটা সংখ্যা নেই। শুরুতে দিনে এক-দুই ঘণ্টা দিয়েও নিয়মিত থাকলে ভালো ভিত্তি তৈরি হয়। সময় বাড়ানোর আগে বিক্রি আর কাজের প্রণালী গুছিয়ে নিন।
একসাথে পড়াশোনা আর ব্যবসা কি কঠিন?
কঠিন হতে পারে, তবে সম্ভব। পরীক্ষার সময় ব্যবসায় কম সময় দিতে হলে আগে থেকে কাস্টমারদের জানিয়ে রাখুন আর নতুন অর্ডার সীমিত রাখুন।
সব কাজ কি একা করতে হবে?
না। পণ্য প্যাক করা আর কাস্টমারের কাছে পাঠানোর কাজ ShopeMart করে। আপনার কাজ কাস্টমারের সাথে কথা বলা, অর্ডার দেওয়া আর শপের প্রচার।
শুরুর কয়েক সপ্তাহের পরিকল্পনা দেখে নিন নতুন রিসেলারের প্রথম ৩০ দিন লেখায়।



