মোবাইল দিয়ে পণ্যের ভালো ছবি ও ভিডিও তোলার সহজ নিয়ম: রিসেলারদের জন্য

অনলাইনে কাস্টমার পণ্যটা ছুঁয়ে দেখতে পারেন না। তাঁর চোখের সামনে থাকে শুধু আপনার দেওয়া ছবি আর ভিডিও। তাই ছবির মান সরাসরি অর্ডারের সংখ্যায় প্রভাব ফেলে। ভালো খবর হলো, এর জন্য দামি ক্যামেরা লাগে না। একটা সাধারণ স্মার্টফোন আর কয়েকটা নিয়ম জানলেই চমৎকার ছবি আর ভিডিও তোলা যায়।
১. সবচেয়ে বড় বিষয়: আলো
ছবির মান অনেকটাই নির্ভর করে আলোর ওপর।
- দিনের আলো ব্যবহার করুন। জানালার পাশে বা খোলা ছায়াময় জায়গায় ছবি তুলুন। সকাল বা বিকেলের নরম আলো সবচেয়ে ভালো।
- সরাসরি কড়া রোদ এড়ান। এতে ছায়া কড়া হয় আর রঙ বদলে যায়।
- ফ্ল্যাশ বন্ধ রাখুন। ফ্ল্যাশ কাপড়ের রঙ আর কাজ নষ্ট করে দেয়।
- ঘরে তুলতে হলে জানালার সামনে পণ্য রাখুন আর আলোটা পাশ থেকে আসতে দিন। রাতে তুলতে হলে সাদা আলো দিন, হলুদ আলোতে রঙ ঠিক আসে না।
রঙ ঠিকঠাক দেখাতে পারলে কাস্টমারের হাতে পণ্য পৌঁছানোর পর "ছবির সাথে মেলেনি" ধরনের অভিযোগ অনেক কমে।
২. পরিষ্কার ব্যাকগ্রাউন্ড
- হালকা রঙের দেয়াল, সাদা চাদর বা কাগজ ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে চলে।
- ব্যাকগ্রাউন্ডে বাড়তি জিনিস, যেমন ঘরের এলোমেলো কোণ, রাখবেন না। কাস্টমারের নজর যেন শুধু পণ্যে থাকে।
- পণ্যের রঙের সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডের একটা তফাত রাখুন। সাদা কাপড় সাদা দেয়ালের সামনে মিশে যায়।
- একই ব্যাকগ্রাউন্ড সব ছবিতে রাখলে আপনার পেজ গোছালো দেখায়। শপের পরিচয় গড়ার এই দিকটা নিয়ে আরও জানতে শপের ব্র্যান্ড গড়ার গাইডটা দেখতে পারেন।
৩. ক্যামেরা আর অ্যাঙ্গেল
- মোবাইলের লেন্স মুছে নিন। আঙুলের দাগে ছবি ঝাপসা হয়।
- ফোন স্থির রাখুন। দুহাতে ধরুন, কনুই শরীরে ঠেকিয়ে রাখুন, বা ছোট একটা স্ট্যান্ড ব্যবহার করুন।
- গ্রিড চালু করুন। ক্যামেরার গ্রিড লাইন চালু করলে ছবি সোজা আর সুষম রাখা সহজ হয়।
- পোশাক হলে একজনকে পরিয়ে বা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে সামনে, পেছনে আর পাশ থেকে ছবি নিন। শুধু ভাঁজ করা অবস্থার ছবি দিলে ফিট বোঝা যায় না।
- কাছ থেকে ছবি নিন। কাপড়ের টেক্সচার, এমব্রয়ডারি আর কাজের কাছাকাছি ছবি কাস্টমারকে মান বুঝতে সাহায্য করে।
- ছবি তোলার সময় জুম কম ব্যবহার করুন। জুম করলে মান কমে। পণ্যের কাছে গিয়ে তুলুন।
৪. প্রতিটি পণ্যের জন্য কোন কোন ছবি লাগবে
একটা পণ্যের জন্য অন্তত এই ছবিগুলো রাখুন:
- পুরো পণ্যের সামনের ছবি।
- পেছনের ছবি।
- কাজ বা টেক্সচারের কাছাকাছি ছবি।
- সাইজ বা মাপ বোঝানো ছবি বা চার্ট।
- একসাথে কয়েকটা রঙ থাকলে সবগুলো রঙের পাশাপাশি ছবি।
৫. ছোট ভিডিও তুলুন
ভিডিও কাস্টমারের মনে বিশ্বাস গড়ে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতেও কাপড়ের নড়াচড়া, ঝোলা আর আলোয় রঙ বোঝা যায়।
- ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে রাখুন।
- মোবাইল আড়াআড়ি না ধরে সোজা (লম্বা ভিডিও) ধরুন, কারণ ফেসবুক রিলস আর স্টোরিতে সেটাই ফিট হয়।
- প্রথম তিন সেকেন্ডে পণ্যের সবচেয়ে সুন্দর অংশ দেখান, যাতে কেউ স্ক্রল করে চলে না যান।
- একটা সহজ কাঠামো: পণ্যের পরিচয়, কাছ থেকে কাজ, সাইজ বা কালারের কথা, শেষে কীভাবে অর্ডার করবেন।
৬. মোবাইলেই একটু এডিট করুন
বেশি এডিটের দরকার নেই, তবে কয়েকটা কাজ করে নিলে ছবি আরও ভালো হয়:
- ছবির উজ্জ্বলতা একটু বাড়ান, তবে এত নয় যে রঙ বদলে যায়।
- অপ্রয়োজনীয় অংশ ছেঁটে ফেলুন।
- সব ছবির মাপ একরকম রাখুন।
- রঙ যেন আসল পণ্যের রঙের কাছাকাছি থাকে। ফিল্টার বেশি দিলে পণ্য হাতে পেয়ে কাস্টমার হতাশ হতে পারেন।
৭. অন্যের ছবি ব্যবহারে সতর্ক থাকুন
ShopeMart-এর পণ্যের পাতায় যে ছবি আছে, সেটা পণ্যের বিবরণ বোঝার কাজে লাগে। নিজের পেজের জন্য আলাদা ছবি তুললে আপনার শপের ধরন আলাদা হয়। অন্য কারও লোগো বা ওয়াটারমার্ক লাগানো ছবি আপনার পেজে ব্যবহার করবেন না।
৮. ছবির সাথে ক্যাপশন
ভালো ছবির সাথে স্পষ্ট ক্যাপশন লিখুন: নাম, কাপড়, কালার, সাইজ আর দাম। ক্যাপশন লেখার আরও কৌশল পাবেন ফেসবুকে বিক্রি বাড়ানোর ৭টি কৌশলে।
ছবি তোলার আগে ছোট চেকলিস্ট
- লেন্স পরিষ্কার।
- দিনের আলো বা ভালো আলো।
- পরিষ্কার ব্যাকগ্রাউন্ড।
- পণ্য ইস্ত্রি করা বা সাজানো।
- সামনে, পেছনে আর কাছের ছবি।
- রঙ আসল রঙের মতো।
ছবি আর ভিডিওর জন্য সহজ কয়েকটা সাজানোর কৌশল
- পণ্য ভালো করে ইস্ত্রি করুন বা ঝাড়ুন। ভাঁজ পড়া কাপড় সস্তা দেখায়। হালকা স্টিমে বা ইস্ত্রিতে সোজা করে নিন।
- হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে সোজা করে ধরুন। দেয়ালের হুকে ঝুলিয়ে ছবি তুললে কাপড়ের ঝোলা আর কাটিং পরিষ্কার বোঝা যায়।
- সাজানোর জিনিস ব্যবহার করুন। জামার পাশে মানানসই গয়না, ব্যাগ বা জুতো রাখলে ছবি আরও জীবন্ত হয়। তবে সেগুলো যদি বিক্রির পণ্য না হয়, ক্যাপশনে স্পষ্ট করে লিখে দিন, যাতে কাস্টমার বিভ্রান্ত না হন।
- মডেল থাকলে সাইজ আর উচ্চতা লিখুন। "মডেলের উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, পরেছেন মিডিয়াম সাইজ" ধরনের একটা লাইন কাস্টমারকে ফিট বুঝতে অনেক সাহায্য করে।
ছোট ভিডিওর স্ক্রিপ্টের একটা নমুনা
২০ সেকেন্ডের একটা ভিডিওর জন্য এই কাঠামো কাজে আসে:
- শুরুর ৩ সেকেন্ড: পণ্যটা সবচেয়ে সুন্দর অ্যাঙ্গেলে দেখান। লেখা দিন, "ঈদের জন্য নতুন কালেকশন"।
- মাঝের ১০ সেকেন্ড: কাপড়ের কাছাকাছি ছবি, কাজ আর রঙ। কাপড় নেড়ে নড়াচড়া দেখান।
- পরের ৫ সেকেন্ড: সাইজ আর কালারের বিকল্প লিখে দেখান।
- শেষের ২ সেকেন্ড: শপের নাম আর কীভাবে অর্ডার করবেন, যেমন "ইনবক্সে মেসেজ করুন"।
মাঝে মাঝে পণ্য প্যাক খোলার দৃশ্য বা কাস্টমারের অনুমতি নিয়ে তাঁর পাওয়া পণ্যের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরলে ভিডিও আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়।
ফাইল গুছিয়ে রাখুন
ছবি আর ভিডিও তোলার পর সেগুলো ফোনের গ্যালারিতে এলোমেলো পড়ে থাকলে পরে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়। পণ্যের নাম বা কোড ধরে একটা করে ফোল্ডার বানিয়ে রাখুন। ভালো ছবিগুলো আলাদা করে রাখলে নতুন পোস্ট বানানোর সময় বাঁচে। ফোনের জায়গা কমে গেলে মাসে একবার পুরনো ছবি ক্লাউডে বা কম্পিউটারে সরিয়ে নিন।
ছবির মান নিয়ে একটা কথা
ভালো ছবি দিলেও পণ্য হাতে পাওয়ার পর কাস্টমার যদি দেখেন ছবির সাথে মিল নেই, তাহলে সেটা ফেরতের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ছবি সুন্দর করতে গিয়ে পণ্যের আসল চেহারা বদলে ফেলবেন না। কাপড়ের রঙ, কাজ আর আকার যতটা সম্ভব সত্যি রাখুন। এতে অর্ডার কিছুটা কম আসতে পারে, কিন্তু যেগুলো আসে, সেগুলো টেকে।
প্রায়ই করা প্রশ্ন
ভালো ছবির জন্য কি নতুন মোবাইল কিনতে হবে?
না। আপনার বর্তমান মোবাইলেই আলো আর ব্যাকগ্রাউন্ড ঠিক রাখলে ভালো ছবি আসে। সরঞ্জামের চেয়ে নিয়ম বেশি জরুরি।
কত ছবি দেওয়া উচিত?
একটা পণ্যের জন্য ৪ থেকে ৬টা ছবি যথেষ্ট। সংখ্যার চেয়ে প্রতিটি ছবি কী তথ্য দিচ্ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
ভিডিওতে কি কথা বলতেই হবে?
না, কথা না বললেও চলে। পণ্যের নড়াচড়া আর ছোট লেখা (টেক্সট) দিয়েও ভিডিও আকর্ষণীয় করা যায়।
ছবি আর ভিডিও দিয়ে কীভাবে অর্ডার আনবেন, তার পরিকল্পনা পড়ুন নতুন রিসেলারের প্রথম ৩০ দিনের গাইডে।



