হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে কাস্টমারের সাথে যোগাযোগ: অনুমতি নিয়ে বিক্রি বাড়ানোর কৌশল

বাংলাদেশে বেশিরভাগ কাস্টমার হোয়াটসঅ্যাপ আর মেসেঞ্জার প্রতিদিন ব্যবহার করেন। এখানে কাস্টমারের সাথে সরাসরি, ব্যক্তিগতভাবে কথা বলা যায়, যা পোস্টে সম্ভব নয়। ঠিকভাবে ব্যবহার করলে এই দুটো মাধ্যম আপনার বিক্রির বড় শক্তি হতে পারে। আবার ভুলভাবে ব্যবহার করলে কাস্টমার বিরক্ত হয়ে আপনাকে ব্লক করে দেবেন। তাই নিয়মগুলো জানা দরকার।
১. সবচেয়ে বড় নিয়ম: অনুমতি
কাস্টমারকে বার্তা পাঠানোর আগে ভাবুন, তিনি কি এই বার্তা পেতে চান? যিনি আপনার কাছ থেকে কিনেছেন বা নিজে থেকে মেসেজ করেছেন, তাঁকে অর্ডার সংক্রান্ত বার্তা পাঠানো স্বাভাবিক। কিন্তু নতুন পণ্যের খবর পাঠাতে চাইলে সরাসরি জিজ্ঞেস করে নিন: "আপু, নতুন কালেকশন এলে কি আপনাকে জানাব?" তিনি রাজি হলে তবেই পাঠান।
- অপরিচিত কারও নম্বর জোগাড় করে বা কেনা তালিকা থেকে বার্তা পাঠাবেন না।
- কেউ "আর পাঠাবেন না" বললে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করুন।
- কাস্টমারের নম্বর বা তথ্য অন্য কাউকে দেবেন না।
অনুমতি ছাড়া বার্তা পাঠানো শুধু অভদ্রতাই নয়, এতে প্ল্যাটফর্ম আপনার অ্যাকাউন্টে বিধিনিষেধও দিতে পারে।
২. হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবসার জন্য আলাদা অ্যাকাউন্ট রাখুন
ব্যক্তিগত নম্বর আর ব্যবসার নম্বর আলাদা রাখলে সুবিধা অনেক। ব্যবসার নম্বরে শপের নাম, লোগো, ঠিকানা আর পরিচিতি দেওয়া যায়। কাস্টমার তখন বুঝতে পারেন এটা কোনো সত্যিকারের শপ। হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবসার অ্যাপে স্বাগত বার্তা, দ্রুত উত্তর আর পণ্যের ক্যাটালগ সাজানোর সুবিধাও থাকে। এগুলো কাজে লাগালে আপনার সময় বাঁচে।
৩. কাস্টমারের তালিকা গুছিয়ে রাখুন
কে কোন পণ্য কিনেছেন, কোন সাইজ, কোন কালার পছন্দ, এসব লিখে রাখুন। রিসেলার প্যানেলের Customer List-এ আপনার কাস্টমারদের তথ্য দেখতে পাবেন। এই তথ্য কাজে লাগালে বার্তা ব্যক্তিগত হয়। সবাইকে একই বার্তা না পাঠিয়ে যিনি শাড়ি পছন্দ করেন, তাঁকে নতুন শাড়ির খবর দিন।
৪. কী ধরনের বার্তা পাঠাবেন
- অর্ডারের পর: "আপু, আপনার অর্ডারটা পেয়েছি। ধন্যবাদ।" আর ডেলিভারির খবর।
- পণ্য পৌঁছানোর পর: "পণ্যটা পেয়েছেন তো? কেমন লাগল?"
- নতুন কালেকশন: মাসে এক বা দুবার, ছবিসহ ছোট বার্তা। সব সময় লেখা সংক্ষিপ্ত রাখুন।
- উৎসবের আগে: আগাম জানিয়ে দেওয়া। মৌসুমে কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন, সেটা নিয়ে আলাদা লেখা আছে: উৎসবে বিক্রি বাড়ানোর পরিকল্পনা।
- আগ্রহ দেখিয়ে অর্ডার না করলে: একবার ভদ্রভাবে মনে করিয়ে দিন। বারবার তাগাদা দেবেন না।
৫. বার্তা কীভাবে লিখবেন
- ছোট রাখুন। লম্বা বার্তা পড়তে কেউ চান না।
- শুরুতে নাম ধরে সম্বোধন করুন।
- একটাই কাজের কথা বলুন, যেমন নতুন পণ্য বা অফার।
- ছবি বা ছোট ভিডিও দিন।
- শেষে কী করতে হবে তা বলুন: "পছন্দ হলে জানাবেন।"
- ভাষা ভদ্র আর আন্তরিক রাখুন।
একটা নমুনা: "আসসালামু আলাইকুম আপু, আমি ... শপ থেকে বলছি। নতুন একটা এমব্রয়ডারি সেট এসেছে, ছবিটা পাঠালাম। আপনার পছন্দ হলে জানাবেন, সাইজ আর কালার জানিয়ে দেব।"
৬. কতবার বার্তা পাঠাবেন
সবচেয়ে বড় ভুল হলো ঘনঘন বার্তা পাঠানো। সপ্তাহে একবারের বেশি নতুন পণ্যের বার্তা না পাঠানোই ভালো। কেউ উত্তর না দিলে বারবার পাঠাবেন না। উত্তর না পেলে ধরে নিন, এখন তাঁর দরকার নেই। এতে সম্পর্কটাও নষ্ট হয় না।
৭. মেসেঞ্জারে সুবিধাগুলো কাজে লাগান
ফেসবুক পেজের মেসেঞ্জারে স্বাগত বার্তা, দ্রুত উত্তর আর সংরক্ষিত উত্তরের সুবিধা থাকে। সাধারণ প্রশ্নের জন্য সংরক্ষিত উত্তর রাখলে বারবার লিখতে হয় না। পেজের মেসেঞ্জারে কাস্টমার প্রথম মেসেজ করলে একটা স্বয়ংক্রিয় উত্তরে জানিয়ে দিন, কখন আপনি উত্তর দেবেন। ইনবক্স আর কাস্টমার সার্ভিস নিয়ে আরও বিস্তারিত আছে কাস্টমার সার্ভিস গাইডে।
৮. কাস্টমারের গোপনীয়তা রক্ষা করুন
কাস্টমারের ঠিকানা, ফোন নম্বর আর কেনাকাটার তথ্য অত্যন্ত ব্যক্তিগত। এগুলো অন্য কাউকে দেখাবেন না, গ্রুপে পোস্ট করবেন না। কাস্টমারের অর্ডারের স্ক্রিনশট দিয়ে রিভিউ দেখাতে চাইলে নাম আর নম্বর ঢেকে দিন এবং আগে অনুমতি নিন। ভরসা এভাবেই তৈরি হয়।
৯. ফল মাপুন
কোন বার্তায় সাড়া বেশি এল, কোন সময়ে উত্তর বেশি আসে, কোন ধরনের পণ্যের খবরে অর্ডার হলো, লিখে রাখুন। কয়েক সপ্তাহে আপনি বুঝে যাবেন কী কাজ করে। যা কাজ করে না, সেটা বন্ধ করুন।
ঝুঁকি আর ভুল, যা থেকে দূরে থাকবেন
- ভুয়া বা বানানো তথ্য পাঠানো। "মাত্র দুটো আছে" বলে ভয় দেখানো যদি সত্যি না হয়, কাস্টমার একদিন টের পাবেনই। সবসময় সত্যি তথ্য দিন।
- অচেনা লিংক পাঠানো। কাস্টমারকে এমন লিংক পাঠাবেন না, যেখানে ঢুকে তিনি ব্যক্তিগত তথ্য দিতে বাধ্য হন। পণ্যের ছবি আর সরাসরি কথাই যথেষ্ট।
- গ্রুপে কাস্টমার যোগ করা। কাস্টমারকে তাঁর অনুমতি ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগ করলে অনেকে বিরক্ত হন আর অন্যদের নম্বর দেখে ফেলেন, যা গোপনীয়তার জন্য ঠিক নয়।
- রাত-বিরেতে বার্তা পাঠানো। দিনের কাজের সময়ের মধ্যে বার্তা পাঠান। গভীর রাতে বার্তা পাঠালে কাস্টমারের ঘুমে ব্যাঘাত হয়।
মেসেজ থেকে অর্ডারে নিয়ে যাওয়ার ধাপ
কাস্টমার যখন আপনার বার্তায় আগ্রহ দেখান, তখন তাঁকে ধাপে ধাপে অর্ডারের দিকে নিয়ে যান।
- ধাপ ১: কী চান, তা জিজ্ঞেস করুন, কোন পণ্য, কোন সাইজ, কোন রঙ।
- ধাপ ২: ঠিক পণ্যের ছবি, দাম আর স্টকের খবর জানান।
- ধাপ ৩: সাইজ নিয়ে নিশ্চিত হোন। প্রয়োজনে সাইজ চার্ট পাঠান।
- ধাপ ৪: নাম, ফোন নম্বর আর পূর্ণ ঠিকানা নিন।
- ধাপ ৫: সব তথ্য একবার পড়ে শুনিয়ে নিশ্চিত করুন, তারপর Add Order পেজে অর্ডার দিন।
- ধাপ ৬: অর্ডার দেওয়া হয়ে গেলে কাস্টমারকে জানিয়ে দিন আর ডেলিভারির খবর দিন।
এই ধাপগুলো মেনে চললে ভুল অর্ডার অনেক কমে, যা বাতিল আর ফেরত কমানোর জন্যও জরুরি। এ নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন অর্ডার বাতিল ও ফেরত কমানোর ৮টি উপায় লেখায়।
ছোট একটা সাপ্তাহিক রুটিন
- সপ্তাহের শুরুতে: কোন কাস্টমারদের আজ খোঁজ নেবেন, তার ছোট তালিকা বানান।
- সপ্তাহের মাঝে: নতুন পণ্যের খবর, ছবিসহ, যাঁরা পেতে চেয়েছেন তাঁদের পাঠান।
- সপ্তাহের শেষে: কে উত্তর দিয়েছেন, কে অর্ডার করেছেন, কার কাছ থেকে প্রশ্ন এসেছে, দেখে নিন আর নিজের খাতায় লিখে রাখুন।
এই ছোট নিয়মিততা আপনাকে কাস্টমারের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখতে সাহায্য করবে, আর কোনো কাস্টমারকে ভুলে যাওয়া থেকেও বাঁচাবে।
কখন ফোনে কথা বলবেন, কখন মেসেজে
সব কথা মেসেজে সারা যায় না। দাম আর সাইজ নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন মেসেজেই ভালো, কারণ কাস্টমার নিজের সুবিধামতো সময়ে উত্তর দিতে পারেন। কিন্তু অর্ডারের ঠিকানা নিশ্চিত করা, বড় অঙ্কের অর্ডার বা কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে একটা ছোট ফোন কলে অনেক সময় সবকিছু দ্রুত মিটে যায়। ফোন করার আগে মেসেজে জিজ্ঞেস করে নিন, "আপু, একটু কথা বলা যাবে?" আর কথার শেষে মূল বিষয়গুলো মেসেজে লিখে পাঠিয়ে দিন, যাতে দুজনেরই হাতে একটা লিখিত রেকর্ড থাকে।
প্রায়ই করা প্রশ্ন
একসাথে অনেককে একই বার্তা পাঠানো কি ঠিক?
যাঁরা পেতে চেয়েছেন, তাঁদের পাঠাতে পারেন। তবু যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত করে লিখুন, আর কেউ চাইলে তালিকা থেকে বাদ দিন।
কাস্টমার আর উত্তর না দিলে কী করব?
একবার ভদ্রভাবে খোঁজ নিন। তারপরেও সাড়া না পেলে চুপ থাকুন। তিনি দরকার হলে নিজেই যোগাযোগ করবেন।
হোয়াটসঅ্যাপে কি পণ্যের পুরো ক্যাটালগ পাঠানো যায়?
পাঠানো যায়, তবে কাস্টমার কী খুঁজছেন, সেটা জেনে সেই অনুযায়ী পছন্দের কয়েকটা পাঠানো বেশি কার্যকর।
পুরো সপ্তাহের কাজের গুছিয়ে নেওয়ার জন্য দেখুন ফেসবুকে বিক্রি বাড়ানোর কৌশল।



